রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার পেছনে উঠে এসেছে মাদকের ভয়াবহতার চিত্র। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পূর্বেও এলাকাটিতে মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার ও বিরোধের জেরে ঘটেছে আরও দুটি মর্মান্তিক খুনের ঘটনা। ধারাবাহিকভাবে অপরাধ সংগঠিত হলেও আড়ালেই রয়ে গেছে নেপথ্যের মূল মাদক কারবারিরা।
পূর্ববর্তী সহিংসতা ও মাদকের আখড়া:
তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি মাছুয়াপাড়া সংলগ্ন তাঁতীপাড়ায় মাদকাসক্ত এক যুবকের ছুরিকাঘাতে খুন হন অটোচালক আমিনুল ইসলাম (৩৫)। এর কিছুদিন পর ১০ এপ্রিল একই এলাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রাকিব হাসান (২০) নামের এক তরুণকে। দুটি ঘটনাই মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ঘটে।
এসব রক্তক্ষয়ী ঘটনার ধারাবাহিকতায় গত ২২ আগস্ট নিজ বাসায় খুন হন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, কন্যা আগামী চক্রবর্তী ও ছোট ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী। বাসার ছাদে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় ওই পরিবারের ওপর পৈশাচিক হামলা চালায় স্থানীয় মাদকাসক্ত দুই যুবক মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ।
গা ঢাকা দিয়েছে মূল কারবারিরা:
হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নিলেও মূল জোগানদাতারা এখনো অধরা। আসামিদের কাছে ইয়াবা বিক্রেতা প্রশান্তসহ স্থানীয় চিহ্নিত মাদক চক্রের সদস্যরা ঘটনার পর থেকেই গা ঢাকা দিয়েছে। ভয় ও আতঙ্কে স্থানীয় অধিবাসীরা মাদক কারবারিদের বিষয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাছুয়াপাড়া, বৈরাগীপাড়া, তাঁতীপাড়া ও শ্যামাসুন্দরী খালের চারপাশের সেতু সংলগ্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের অবাধ বিচরণ।
সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে মাদক, রংপুরে ট্রানজিট:
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রংপুর বিভাগের আটটি জেলার সীমান্তবর্তী অন্তত ৪৩টি সীমান্ত পথ ব্যবহার করে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও হেরোইন দেশে প্রবেশ করছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে রংপুর নগরীকে ট্রানজিট পয়েন্ট বানিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মাদক পাচার করছে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় চোরাকারবারি চক্র।
পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, মহানগরে অপরাধ দমনে গত তিন মাসে বিভিন্ন মামলায় ১,৬২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কেবল জুলাই মাসেই ৬০টি মাদক মামলায় ৮০ জনকে আসামি করে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সুশীল সমাজের বক্তব্য:
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রংপুর জেলা কমিটির আহ্বায়ক মো. আল মামুন বলেন, "মাছুয়াপাড়ার অধিকাংশ পরিবারই কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিগত হত্যাকাণ্ডের পরই যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিত, তবে এই শিক্ষক পরিবারকে এমন নির্মম পরিণতি ভোগ করতে হতো না।"
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী জানান, "চার খুনের ঘটনায় অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক মাদকাসক্ত ছিল। ঘটনার পেছনে জড়িত প্রশান্তসহ পুরো সিন্ডিকেটকে ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের অনুপ্রবেশ রোধে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে আরও কঠোর ভূমিকা রাখতে হবে এবং চাহিদা কমাতে মাদকসেবীদের চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।
এ জাতীয় আরো খবর..