ভ্যাপসা গরম আর তার ওপর দিনে-রাতে পাল্লা দিয়ে চলা ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে রংপুরের মানুষের জীবন। আধা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের এক ঘণ্টা টানা গায়েব—এমন পরিস্থিতিতে নগরী ও গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। গৃহস্থালি কাজ, ঘুম, ব্যবসা-বাণিজ্য ও খামার পরিচালনা থেকে শুরু করে সব জায়গায় দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিশু, বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা।
বাসাবাড়ি ও জনজীবনের দুর্ভোগ:
নগরীর জুম্মাপাড়ার বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, "বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। সকালে সময়মতো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। ছেলে না খেয়ে স্কুলে যাচ্ছে, স্বামীও না খেয়ে অফিসে বের হচ্ছে।"
নগরীর গৃহিণী কহিনুর বেগম ও চাকরিজীবী আব্দুর রশিদ জীবন জানান, রাতে লোডশেডিংয়ের কারণে ঘুম না হওয়ায় সকালে কাজে মন বসানো যায় না। তীব্র গরমে বৃদ্ধ ও শিশুদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করেও সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
ব্যবসা, কারখানা ও খামারে ধস:
আর কে রোডের মুদ্রণ ব্যবসায়ী শাহ বায়েজিদ আহমেদ আক্ষেপ করে বলেন, "আমার ব্যবসা পুরোপুরি বিদ্যুৎ নির্ভর। কিন্তু দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় আয় একবারে তলানিতে। কর্মচারীর বেতন ও দোকান ভাড়া দেওয়াই দায় হয়ে পড়েছে।"
একই চিত্র গ্রামের খামারগুলোতে। তারাগঞ্জের ইকরচালী গ্রামের মুরগি খামারি হৃদয় হোসেন জানান, ফ্যান ও পানির পাম্প চালাতে না পেরে গরমে পোল্ট্রি খামার টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এছাড়া ছোট ছোট কলকারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় অলস সময় পার করছেন শ্রমিকরা।
সুশীল সমাজের বক্তব্য:
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর মহানগরের সভাপতি মো. জোবাইদুল ইসলাম বলেন, "লোডশেডিংয়ের প্রভাবে রংপুরের সর্বস্তরের মানুষ নাজেহাল। অবিলম্বে এই সংকট নিরসন না হলে ক্ষোভ আরও দানা বাঁধবে।"
বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও ঘাটতির চিত্র:
নেসকো রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম মণ্ডল জানান, সংকটটি শুধু রংপুরে নয়, সারা দেশেই জাতীয় গ্রিডের উৎপাদন ঘাটতির কারণে তৈরি হয়েছে।
রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার মোনোয়ারুল ইসলাম ফিরোজী জানান, তাঁদের ৭৭টি ফিডারে ১১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭৫ থেকে ৮০ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে, রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার মুহাম্মদ আশরাফ উদ্দিন খান জানান, ৯৮টি ফিডারে ১২৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে ৭০ থেকে ৮২ মেগাওয়াট। তিনি বলেন, "১০-১২ দিন আগেও এলাকাভিত্তিক ১০-২০ শতাংশ লোডশেডিং হতো, যা এখন বেড়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে ঠেকেছে।"
সংকটের মূল কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে অভ্যন্তরীণ ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গরমে চাহিদা বাড়ায় জাতীয় গ্রিডে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর..