রংপুর নগরীকে যানজটমুক্ত করতে ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদে প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান চললেও মিলছে না কোনো স্থায়ী সুফল। অভিযানের দু-এক দিন যেতে না যেতেই পুরানো চেনা রূপ ফিরে আসছে। ফুটপাত দখল করে অবৈধ ‘দোকান-বাণিজ্য’ এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রভাবশালী চক্র।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ও ফুটপাতে থাকা স্থায়ী দেওয়াল, ঘর ও গাছের সঙ্গে ঝুলানো মিটার বক্স থেকে অবৈধ সাবলাইন দিয়ে ভাসমান দোকানগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। একটি বা দুটি মিটারের নামে শতাধিক সংযোগ বা সাবলাইন বানিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগকে ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। এ জালিয়াতির সাথে বিদ্যুৎ বিভাগের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
দখলে যেসব গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়ক:
নগরীর স্টেশন রোড, জাহাজ কোম্পানি মোড়, সিটি বাজার, ধাপ, লালবাগ, শাপলা চত্বর, মেডিকেল মোড়, জিলা স্কুল মোড়, টাউন হল-সংলগ্ন জুলাই স্মৃতিসৌধ্য চত্বর, পায়রা চত্বর, পার্ক মোড়, মডার্ন মোড় ও দেওয়ানবাড়ী রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ফুটপাত শতভাগ দখল হয়ে গেছে।
জাহাজ কোম্পানি মোড় থেকে বেতপট্টি, লোহাপট্টি, সোনাপট্টি ও দেওয়ানবাড়ী রোড পর্যন্ত হেঁটে চলাচল করাও দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কের ওপর ভাসমান পোশাকের দোকান, ফল-সবজির দোকান এবং এলোমেলো গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে প্রধান সড়কগুলো এখন গ্রামের জটলাময় হাটবাজারে পরিণত হয়েছে।
ফুটপাত দখল ও ফুটপাত বাণিজ্য:
অভিযোগ উঠেছে, পথচারীদের যাতায়াতের ফুটপাত দখল করে দোকান বসিয়ে চক্রটি প্রতি মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে। এমনকি অনেক স্থায়ী দোকান মালিকও তাঁদের দোকানের সামনের ফুটপাত লিজ দিয়ে দৈনন্দিন ভিত্তিতে ভাড়া আদায় করছেন। ফুটপাত না পেয়ে সাধারণ পথচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়কে নেমে আসায় নিত্যদিন দুর্ঘটনা ঘটছে।
৬০ হাজার অবৈধ অটোরিকশার চাপ:
নগরবাসী জানান, রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অনুমোদিত অটোরিকশার সংখ্যা মাত্র সাড় আট হাজার হলেও বর্তমানে নগরীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রায় ৬০ হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এতে ১০ মিনিটের পথ যেতে সময় লাগছে আধা ঘণ্টারও বেশি। যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকাও দায়সারা বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য:
দখল ও সার্বিক ভোগান্তির বিষয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন-নবী চৌধুরী বলেন, "শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালে স্থায়ী সমাধান হবে না। হকারদের জন্য মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিকল্পিত বিকল্প পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনা করছে সিটি কর্পোরেশন।"
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, "ফুটপাত দখল নগরের সৌন্দর্য বিনষ্টের পাশাপাশি মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ ও নজরদারি বাড়াতে কাজ করছে জেলা প্রশাসন।"
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মো. আবদুল মাবুদ জানান, সড়ক ও ফুটপাত শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখতে ট্রাফিক পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। তবে সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মত দেন তিনি।