পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের (পিওকে) রাওয়ালাকোট ও মিরপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাত কেবল স্থানীয় কোনো নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতাতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি পাকিস্তানের তথাকথিত গণতন্ত্র, ভিন্নমত প্রকাশ ও ‘আজাদ কাশ্মীর’ সংক্রান্ত বহুল প্রচারিত সরকারি বয়ানকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্বমঞ্চে কাশ্মীরিদের অধিকার রক্ষার দাবি করলেও নিজ দেশে নাগরিক অধিকার খর্ব করায় খোদ পাকিস্তানি তরুণ সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তোপের মুখে পড়েছে শেহবাজ শরিফের প্রশাসন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) পাকিস্তানি এক তরুণীর মন্তব্য ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে, যা দেশটির বর্তমান শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি লেখেন—"ভারতে বলা হয়, 'ভয়ের ওপারে জয়'; আর পাকিস্তানে গল্পটা এমন যে, 'বাড়ির সামনে জিপ দাঁড়িয়ে আছে'।"
অস্থিরতার মূলে 'জেএএসি' ও বিতর্কিত আইন
উত্তেজনার মূল কারণ হলো স্থানীয় অধিকার আদায়ে সোচ্চার নাগরিক জোট 'জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি' (জেএএসি)-এর আন্দোলন। আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর আইনসভায় ১২টি শরণার্থী আসন সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার হয় এই জোট। কিন্তু সরকার আলোচনার পথ না হেঁটে জেএএসি-কে সরাসরি 'সন্ত্রাসবিরোধী আইনে' নিষিদ্ধ করে এবং কঠোর অভিযানে নামে।
নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সরাসরি গুলি চালালে বেশ কয়েকজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হন। একই সাথে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল 'পিটিআই' দমন-পীড়ন ও অবাধ পরিবেশের অভাবে স্থানীয় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে।
ক্ষুব্ধ তরুণসমাজ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিতর্কিত উক্তি
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, তরুণ সমাজের বড় অভিযোগ—পাকিস্তানি মূলধারার সংবাদমাধ্যমে ভারতের শিক্ষার্থীদের যেকোনো আন্দোলন বিশাল গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হলেও রাওয়ালাকোটের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত পুরোপুরি চেপে যাওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে আগুনে ঘি ঢেলেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। এক বিবৃতিতে তিনি আন্দোলনকারীদের 'ভারতের মতোই শত্রু' হিসেবে অভিহিত করলে ব্যাপক নিন্দার ঝড় ওঠে। সমালোচকদের প্রশ্ন—নিজ দেশের প্রতিবাদী নাগরিকদের যদি রাষ্ট্র 'শত্রু' হিসেবে দেখে, তবে সেখানে মানবিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের কোনো অস্তিত্ব অবশিষ্ট থাকে না।
মোবাইল-ইন্টারনেট বন্ধে জাতিসংঘের উদ্বেগ
কয়েক সপ্তাহ ধরে রাওয়ালাকোটসহ আশপাশের এলাকায় মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। এই ইস্যুতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জেএএসি-কে নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং সহিংসতায় প্রাণহানির নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছেন। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রধান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিও যোগাযোগব্যবস্থা দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন রাখা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাওয়ালাকোটের পরিস্থিতি এখন সাধারণ কোনো সীমান্ত বিক্ষোভ নয়; এটি মূলত পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র কতটুকু ভিন্নমত বা গণতন্ত্র সহ্য করতে প্রস্তুত—তার একটি জ্বলন্ত পরীক্ষা।