নিখোঁজ এক কিশোরীকে উদ্ধার করতে গিয়ে ঢাকার সাভারে পুলিশের অভিযান চলাকালে ছাত্রদল নেতা মনোয়ারুল বকসির (৩০) রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ মৃত্যুর পেছনে পুলিশের সরাসরি সংযোগ ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তুলে মরদেহ নিয়ে পীরগাছা থানা ঘেরাও এবং সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন নিহতের স্বজনেরা।
আজ শনিবার (৮ আগস্ট ২০২৬) সকাল ৮টার দিকে রংপুরের পীরগাছা থানার সামনের সড়কে মরদেহবাহী গাড়ি রেখে বিক্ষুব্ধ স্বজন ও এলাকাবাসী প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। এতে ওই সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় সিনিয়র রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আশ্বাসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
নিহতের পরিচয়:
নিহত মনোয়ারুল বকসি (৩০) সাভার থানা ছাত্রদলের সহসভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের দক্ষিণ হাতীবান্ধা গ্রামের বাসিন্দা জাফর বকসির ছেলে। পরিবারটি দীর্ঘ দিন ধরে সাভারে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছিল।
পুলিশের দাবি ও ঘটনার বিবরণ:
পুলিশ সূত্র জানা যায়, গত ২৩ জুলাই পীরগাছা উপজেলার কৈকুড়ি ইউনিয়নের মোংলাকুটি গ্রাম থেকে মিমি আক্তার (১৫) নামের এক কিশোরী নিখোঁজ হয়। এ বিষয়ে তার বাবা পীরগাছা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
প্রযুক্তির সহায়তায় নিখোঁজের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে গত ৭ আগস্ট পীরগাছা থানা-পুলিশ সাভার থানা-পুলিশের যৌথ সহায়তায় ঢাকার সাভারের লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (বিপিএটিসি) স্টাফ কোয়ার্টারে অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানকারী পুলিশের দাবি, তল্লাশি চলাকালে হঠাৎ ছাদ থেকে কিছু নিচে পড়ার বিকট শব্দ হয়। পরে নিচে গিয়ে মনোয়ারুল বকসিকে রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তাঁকে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসারত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
পরিবারের পাল্টা অভিযোগ ও হত্যাকাণ্ডের দাবি:
তবে পুলিশের এই ভাষ্য পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন নিহতের পরিবার ও স্বজনেরা। তাঁদের দাবি, এটি কোনো দুর্ঘটনাজনিত বা লাফিয়ে পড়ার ঘটনা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
স্বজনরা জানান, উদ্ধার হওয়া কিশোরী মিমির সাথে মনোয়ারুলের ভাগনে শাহরিয়ার কবির সৌমিকের প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তারা স্ব ইচ্ছায় বিয়ে করে সাভারে সংসার শুরু করেছিল। পরিবারের অভিযোগ— অভিযানকালে পুলিশের দলটির সাথে মিমির বাবা ও অপর এক ব্যক্তি পুলিশের ভুয়া পোশাক পরে যুক্ত ছিলেন। তারাই কৌশলে মনোয়ারুলকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছেন।
পরিস্থিতি সামাল ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া:
সকালে থানা ঘেরাও ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির খবর পেয়ে পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি নিহতের স্বজন ও বিক্ষুব্ধদের সাথে কথা বলে আইনি প্রক্রিয়ার আশ্বাস দিয়ে শান্ত করেন।
বিএনপি নেতা আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা বলেন, "আইনের ঊর্ধ্বে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা নয়। আমরা এ মর্মান্তিক ঘটনার একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের বিচার দাবি করছি।"
অভিযোগ প্রসঙ্গে পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিম মালিক জানান, "ঘটনাটি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। নিহতের স্বজনদের সুনির্দিষ্ট এজাহার বা মামলা দায়ের করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমেই পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হবে। পাশাপাশি সাভারের অভিযান চলাকালে পুলিশ সদস্যদের কোনো গাফিলতি বা বিতর্কিত ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"