জুলাই অভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা ও অন্তর্দাহ কোনো একক গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের একচ্ছত্র স্বত্ব হতে পারে না, বরং এটি সর্বস্তরের সাধারণ ছাত্র-জনতার অসামান্য আত্মত্যাগের ফল বলে মন্তব্য করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। তিনি আরও যোগ করেন, গণঅভ্যুত্থানের এই মহান চেতনা বুকে ধারণ করেই নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে।
আজ বুধবার (৫ আগস্ট ২০২৬) সকাল সাড়ে ১০টায় রংপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসন আয়োজিত সংবর্ধনা ও আলোচনা সভায় এসব কথা তুলে ধরেন তিনি। অনুষ্ঠানটির মূল প্রতিপাদ্য ছিল, "জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ"।
রংপুর জেলা প্রশাসন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার এবং জীবিত জুলাই যোদ্ধাদের বিশেষ সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
বক্তৃতা শুরুর প্রাক্কালে আরএমপি কমিশনার জুলাই বিপ্লবে আত্মদানকারী সমস্ত শহীদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত প্রার্থনা ও গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন। এ সময় তিনি সরকারি গেজেট তালিকাভুক্ত ১৩৫ জন শিশুসহ মোট ৮৩৪ জন বীর শহীদের অবদানের কথা স্মরণ করেন; যার মধ্যে বিশেষভাব উঠে আসে রংপুরের শহীদ আবু সাঈদ ও চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিম আকরামের নাম।
তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে উল্লেখ করেন, "গর্ভের শিশু, চার বছর বয়সী আহাদ কিংবা নারী শিশু রিয়া গোপের মতো শিশুদের আত্মত্যাগ এই গণঅভ্যুত্থানের গভীরতা ও ব্যাপকতাকে ফুটিয়ে তোলে। এই আত্মদান জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।"
শহীদ ও যোদ্ধা পরিবারের পুনর্বাসনে জোর
কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেন, "আজ আমি পুলিশ কমিশনারের যে চেয়ারে বসে আছি, তার পেছনে এ দেশের সাধারণ মানুষের ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। শহীদ ও আহতদের পরিবারের প্রতি আমাদের রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা রয়েছে। এই সম্মান কেবল এক দিনের সংবর্ধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, তাঁদের পাশে বাস্তবিকভাবে দাঁড়াতে হবে।"
তিনি ঘোষণা করেন, রংপুরে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি শহীদ ও যোদ্ধা পরিবারের তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন। ভবিষ্যতে মেট্রোপলিটন পুলিশের আউটসোর্সিং নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধি-বিধান মেনে এসব পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি তিনি বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন এবং রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকেও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ ও ছাত্র সমাজের প্রতি আহ্বান
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন পুলিশ কমিশনার। তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, "শিক্ষার্থীদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক, কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে বহিরাগতদের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ছাত্র সংগঠনগুলোকে কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে আরও শৃঙ্খল ও সহনশীল হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচার বা ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে হবে।"
বক্তব্যের শেষাংশে কমিশনার আবদুল মাবুদ দেশ-বিদেশে অবস্থানরত রংপুরবাসীকে মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে কোনো রকম ব্যক্তিগত স্বার্থ বা প্রচারণার উদ্দেশ্যে নয়, বরং আন্তরিকভাবে জুলাই শহীদ ও যোদ্ধা পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য, বীর জুলাই যোদ্ধা, বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।